বারুইপুরে সার্জিক্যাল শিল্পের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক

0
342

প্রশান্ত ঘোষ, বারুইপুর; শুনলে হয়তো অনেকেই চমকে যাবেন! এক সময় ইউরোপ-আমেরিকায় সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহের আঁতুড়ঘর ছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুর৷ অপারেশন থিয়েটারে সাহেব ডাক্তারদের হাতে থাকত বারুইপুরের ছুরি-কাঁচি-ছুঁচ৷ রাষ্ট্রপুঞ্জের শিল্পোন্নয়ন নিগম (ইউনিডো)-এর ম্যাপেও সার্জিক্যাল সিটি বলে সার্চ দিলে বারুইপুর দেখাত৷ যদিও সেই ম্যাপ থেকে আজ হারিয়ে গিয়েছে বারুইপুর৷ সরকারি উদাসীনতা, সঙ্কীর্ণ রাজনীতি, উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণের অভাবে এখন ধুঁকছে এই শিল্প৷

নেই পরিকাঠামো৷ নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি৷ তাই ক্রমশই অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে হয়েছে এবং হচ্ছে৷ মার খাচ্ছে ব্যবসা৷

বর্তমানের হতদরিদ্র চেহারা দেখে অতীতের গৌরবকে মেলানো প্রায় অসম্ভব৷ অথচ শুরুটা হয়েছিল স্বাধীনতারও আগে৷ এ দেশের কামারদের তৈরি যন্ত্রপাতি পাড়ি দেওয়া শুরু করে ব্রিটেন, জার্মানি-সহ ইউরোপের নানা দেশ ও আমেরিকায়৷ সেটা ১৯৩৭ সাল৷ দা-কোদাল-কুড়ুল বানাতে বানাতে কামাররা হাত পাকাল ছুরি-কাঁচি-ছুঁচ তৈরিতে৷ সাহেব ডাক্তারদের তা বেজায় পছন্দ হওয়ায়, বিলেতের হাসপাতালগুলিতে ছেয়ে গেল এ দেশের কামারশালায় তৈরি সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি৷ এই কাজে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ল বারুইপুর৷ যদিও সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে, ক্রমেই ধ্বংসের মুখে বারুইপুরের ভুবনবিখ্যাত সার্জিক্যাল শিল্প৷

এক সময়ে লক্ষাধিক মানুষ কাজ করতেন বারুইপুরের সার্জিক্যাল যন্ত্র তৈরির শিল্পে৷ এখন তা মেরেকেটে দুই থেকে আড়াই হাজারে দাঁড়িয়েছে৷

বারুইপুর বিডিও অফিস লাগোয়া পিয়ালি ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউনশিপ৷ এই টাউনশিপকে কেন্দ্র করেই এক সময় কল্যাণপুর, বিষ্ণপুরের জুলপিয়া, ভাঙড়ের চন্দনেশ্বর, বারুইপুরের চম্পাহাটি, মগরাহাট, চাকদা, উস্থি, বেহালায় ছড়িয়ে পড়েছিল সার্জিক্যাল শিল্প৷ কয়েকবছর আগেও ৬০০ ইউনিট কাজ করত এই অঞ্চলে৷ এর মধ্যে কামারশালা ২৫০টি, ১২০টি পালিশ কারখানা৷ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষ যুক্ত ছিলেন এই পেশায়৷ বছরে ব্যবসা আসত একশো কোটি৷ এখন তা মেরেকেটে আট থেকে দশ কোটিতে ঠেকেছে৷ রুজিরুটির সংস্থান হয় এখন দু থেকে আড়াই হাজার মানুষের৷

কিন্তু কেন এমন বেহাল দশা? বারুইপুর সার্জিক্যাল ইনস্ট্রূমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাপেক্স অ্যসোসিয়েশন (বসিমা)-র সম্পাদক কমল দাসের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খোলসা হল৷ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মালিক-শ্রমিকরাই রুগ্নপ্রায় শিল্প বাঁচাতে বসিমা তৈরি করেছিলেন৷ কমল দাস বললেন, ‘বিশ্বায়নের জেরে আমরা প্রথম ধাক্কা খাই৷ ১৯৯৭ থেকে চিন আর পাকিস্তান উন্নত সব মেশিন কাজে লাগিয়ে সস্তায় ভালো জিনিস তৈরি করতে শুরু করে৷ ওদের রন্তানির বাজার চাঙ্গা হতেই বিপদ বাড়ে আমাদের৷ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেছিলাম৷ কিন্তু সে জন্য যে পরিমাণ সরকারি সহায়তা চেয়েছিলাম তা পাইনি৷ ফলে আজ ধ্বংসের পথে প্রাচীন এই শিল্প৷’

রাষ্ট্রপুঞ্জের শিল্পোন্নয়ন নিগমের প্রস্তাবে ঘটা করে কমিউনিটি ফেসিলিটি সেন্টার খুলেও পরিকল্পনার অভাব সর্বত্র৷

সার্জিক্যাল শিল্প বাঁচাতে ২০০০ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের শিল্পোন্নয়ন নিগম (ইউনিডো) বারুইপুরে একটি সার্ভে করেছিল৷ তখন প্রস্তাব দেওয়া হয় এই শিল্প বাঁচাতে হলে একটি কমন ফেসিলিটি সেন্টার বা সিএফসি তৈরি করা দরকার৷ ইউনিডোর পরামর্শ মেনে কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগে ২০০৪ সালে ক্ল্যাস্টার ডেভেলপমেন্ট শুরু হয়৷ ২০০৫ সালে ৪ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা বরাদ্দও হয়৷ সেই টাকায় বেশ কিছু আধুনিক মেশিন কেনা হলেও, অভিযোগ গত আড়াই বছরে ১৫ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার বরাদ্দ আটকে রেখেছে রাজ্য সরকার৷ ফলে অতি প্রয়োজনীয় দুটি মাইক্রো টুলিং মেশিন কিনতে পারছেন না বাসিমার সদস্যরা৷

এ ব্যাপারে বারুইপুর ক্ল্যাস্টার ডেভেলপমেন্ট -এর অফিসার তথা বারুইপুর ব্লকের আইডিও বরুণ দত্ত বলেন, ‘আমি কোনও মন্তব্য করব না৷ যা বলার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলবেন৷’ যাঁর বিরুদ্ধে টাকা আটকে রাখার অভিযোগ, সেই ডিস্ট্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্টারের জেনারেল ম্যানেজার গৌতম দাস বলেন, ‘বরাদ্দের টাকায় দুটো ছোট মেশিন কেনার টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল৷ সেটা কেন এগোয়নি তা খোঁজ নিয়ে বলতে পারব৷’

চাপানউতোর চলছে৷ হয়তো ভবিষ্যতেও চলবে৷ কিন্ত্ত সমাধান ? তা কি অধরাই থেকে যাবে ? এক সময় গোটা পৃথিবীতে সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী শিল্পের ওপরেই যেন নেমে এসেছে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক৷৷

Leave a Reply