তমাল সরকার, বারুইপুর; অমানবিক বললেও কম বলা হবে। দুটি অংক না পারায় তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রকে বেধড়ক মারধোরের অভিযোগ উঠল বাড়িতে পড়াতে আসা এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। বারুইপুর পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের সমির মিস্ত্রি পেশায় মেকানিক, একটি বেসরকারী সার্ভিস সেন্টারে কাজ করে। পুজোর সময় রোড অ্যাক্সিডেন্টে পা ভেঙে যায়। কিন্তু তা ঠিক মত সেট না হওয়ায় দিন পনের হল স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ভেলোরে চিকিৎসা করাতে যান। আর তাদের একমাত্র সন্তান সায়নের দায়িত্ব সমির বাবুর ভাই স্বপন বাবুর উপর দিয়ে গিয়েছেন।

সায়ন বারুইপুরের রামকৃষ্ণ আশ্রম ইনস্টিটিউটের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মাস ছয়েক আগে থেকেই আলপনা সরকার নামে এক গৃহ শিক্ষিকা সায়নকে তাদের বাড়িতে পড়াতে আসে। অন্যান্য দিনের মত গত বুধবার বিকালে সায়নকে পড়াতে আসে তার আলপনা আন্টি। তখন সবে সন্ধ্যে নেমেছে আসে পাসের বাড়িতে শাঁখ ঘন্টার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সায়ন। আর তখনি আচমকা আন্টি রুদ্রমুর্তি ধারন করে প্রথমে পেন্সিল বক্স ও সেটি ভেঙে গেলে স্কেল দিয়ে অনবরত মারতে থাকে। কারন সে নাকি দুটো অঙ্ক ভুল করেছে।

আতঙ্কে যন্ত্রনায় ছটপট করতে থাকে সায়ন। ভয়ে বিস্ময়ে দু চোখ দিয়ে বইতে থাকে অশ্রুধারা। তখন সায়ন ভেবে পাচ্ছেনা সে কি করবে। বাঁচাও বাঁচাও বলে আর্তনাদ করবে, কিন্তু কে বাঁচাবে। মা বাবা কাকা কেউ তো নেই বাড়িতে। অসহায় সায়ন শুধু কেঁদে যায়। তাতেও নির্দয় শিক্ষিকার হাত কাঁপেনি। হাতের ও পায়ের কোথাও কোথাও কেটে গিয়ে রক্ত বার হচ্ছে। আলপনা আন্টি পড়ানো বন্ধ করে চলে গিয়েছে। সায়ন দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে ঠাম্মা বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে। ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে। ততক্ষনে কাকা স্বপন মিস্ত্রি কাজ সেরে বাড়ি ফিরেছে। ভাইপোর এই অবস্থা দেখে আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করেন, কি করে কে করল তোর এই অবস্থা। সায়ন হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে কাকুকে জরিয়ে ধরে বলে আমি অঙ্ক পারিনি তাই আন্টি মেরেছে। সব শুনে প্রথমে যন্ত্রনায় ছটকাতে থাকা সায়নের শরীরে ফোলা জায়গায় বরফ ও যেখানে কেটে গিয়েছে সেখানে ওষুধ লাগান। পরে আলপনা দেবীকে ফোন করলে তিনি বলেন তাকে যেহুতু পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাই সে সায়নকে মেরেছে অঙ্ক না পারার জন্য। এছাড়াও হুমকি দেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে স্বপন বাবুর নামে থানায় শ্লীলতাহানির অভিযোগ করবেন। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে বারুইপুর থানায় সায়নের কাকা শিক্ষিকা আলপনা সরকারের বিরুদ্ধে তার ভাইপোকে মারধোরের অভিযোগ ও তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ জানান। শুক্রবার সকালে গ্রেপ্তার করা হয় শিক্ষিকা আলপনা সরকারকে। অসুস্থ সায়নের পরিবার অভিযুক্ত শিক্ষিকার উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

দুদিন হল মানসিক ও শারীরিক ভাবে অসুস্থ সায়ন স্কুলে যেতে পারছেনা, এখনও খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে সায়নের চিকিৎসা চলছে। ঘটনার পর থেকে সায়ন রাতে ঘুমের মধ্যেই মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলতে থাকে আন্টি আর ভুল হবেনা আমাকে মেরোনা আমাকে মেরোনা।

এখনও ছোট্ট সায়নের দুটো হাতে, হাটুতে, পায়ে জমাট রক্তের কালসিটে দাগ রয়ে গেছে। হয়ত কিছুদিন পর সেই দাগ মিলিয়ে যাবে। কিন্তু নির্দয় অমানবিক শিক্ষিকার সেই ভয়াল কুৎসিত রুপ কি সে কখনো ভুলতে পারবে? সে কি পারবে কখনও শিক্ষক-শিক্ষিকাকে ভালোবাসতে, আপন করতে? সেটা হয়ত সময় বলে দেবে।

Video Courtesy:- Pradip Kumar Singha

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here