নিজস্ব প্রতিনিধি, বারুইপুর; আজ শারদীয়া দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্ন, আজ শুভ মহালয়া। পিতৃপক্ষের অবসান। আগামীকাল থেকে দেবীপক্ষের সূচনা। তবে এ দিনটির তাৎপর্য মূলত ভিন্ন। শাস্ত্রমতে দেবীপক্ষের আগের কৃষ্ণা প্রতিপদে মর্ত্যধামে নেমে আসেন পিতৃপুরুষরা। এই মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন তারা তাদের পূর্বপুরুষকে স্মরন করে,পূর্বপুরুষের আত্নার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করেন । সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে প্রয়াত আত্নাদের মর্ত্যলোকে পাঠিয়ে দেয়া হয়, প্রয়াত আত্নার যে সমাবেশ হয় তাকে মহালয় বলা হয় । মহালয় থেকে মহালয়া। পিতৃপক্ষেরও শেষদিন এটি । মহালয়াতে যারা গঙ্গায় অঞ্জলি প্রদান করেন পূর্বপুরুষদের আত্নার শান্তির জন্য, তারা শুধু পূর্বদের নয়, পৃথিবীর সমগ্র কিছুর জন্য প্রার্থনা ও অঞ্জলি প্রদান করেন ।

বারুইপুরে পুরাতন বাজারের নিকট সদাব্রত ঘাট, পুরন্দরপুরের কাছে পুরন্দরপুর ঘাট ও বিভিন্ন পবিত্র ঘাটে হয়ে গেল তর্পন। প্রশাসন সতকর্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মোতায়েন ছিল সিভিক ভলান্টিয়ার। এছাড়া দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ‘সেবা ভারতী” প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ছিল জলসত্রের ব্যবস্থা।

মহালয়া দিয়েই কার্যত বাঙালির বছরকার উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়ল। দেবী আসছেন ঘরে। তারই প্রস্তুতি তুঙ্গে। আম বাঙালির দিনটা শুরু হয়েছে খুব ভোরে-রেডিওয় কান পেতে। আকাশবাণীতে মহিষাসুরমর্দিনী, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর সম্মোহক কন্ঠে চণ্ডীপাঠ- “যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমঃ নমঃ।”

মহালয়া দুর্গা দেবীর আগমনী বার্তা। মা আজ পা রেখেছেন মর্ত্যলোকে, বছর ঘুরে উমা দেবী আসছেন তার বাপের বাড়ি। সঙ্গে নিয়ে আসেন গণেশ, কার্ত্তিক, লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে। প্রতিবছর শরৎকালে দেবী দুর্গার এই আগমন নিজ ভূমিতে। দেবী কোন বাহনে চড়ে আসবেন ও ফিরে যাবেন তার ওপরই নির্ভর করে বাঙালির জীবনাচরণ ও প্রকৃতি। যেমন এবার দেবী আসছেন নৌকায়। এর অর্থ শস্য বৃদ্ধি ও জল বৃদ্ধি। ফিরে যাবেন ঘোটকে। এর অর্থ ছত্রভঙ্গস্তরঙ্গমে। অর্থাৎ নৌকায় আগমন ও ঘোটকে গমনে শস্য ও জল বৃদ্ধি পাবে, এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংসারিক ক্ষেত্রে কিছুটা অস্থিরতা প্রকাশ পাবে। ফল যাই হোক, সকল আসুরিক শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শান্তি আনবেন ‘মা’।

মহালয়ার দিন থেকে ঢাকের কাঠি, ঘণ্টা-কাঁসার শব্দ, মঙ্গল শাঁখ ও উলু ধ্বনিতে কেঁপে উঠবে প্রতিটি মন্দির। মায়ের আগমনে চারদিকে আনন্দ আয়োজন সম্পন্ন করার তাড়া এখন সবার। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। খুশির আনন্দ ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘরে ঘরে, মন্দিরে মন্দিরে। আজ চণ্ডী পাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। মর্ত্যলোকে, আবাহন ঘটবে দেবী দুর্গার।

“মহামায়ায় যতই মানাক সিংহ এবং সিংহাসনে
রামপ্রসাদের বেড়ার ধারে দেখেই যে হয় হিংসা
মনে বাদ্য ঘটা লক্ষ বলি, অলক্ষ্যে সব যায় যে চলি
বক্ষে জাগে দৃষ্টি মায়ের, মিষ্ট হাসি চন্দ্রাননে । “

কীভাবে, কোন জাদুমন্ত্রে, ধীরে – ধীরে একটা আস্ত সকাল মেলে ধরে, এক অলীক মুগ্ধতা আমাদের ছুঁয়ে যায় – সেতো এই আসন্ন মহালয়ার সকালেই। ভোরের টুপটাপ ঝরে পড়া শিশির, শিউলির গন্ধ মাখা উঠোন, কাশবনে হিল্লোলে উত্সবের হাতছানি।

মা আসছেন, আনন্দময়ী মৃন্ময়ী মা।

Photo Courtesy: Anirban Bhattacharya

“ডাকলে পরে ছুটে এসে জড়াবি তুই আমার গলে।
তুই মা হবি না মেয়ে হবি দে মা উমা আমায় বলে।”

মহালয়ার শুভ দিনে সকলের জন্য রইল আন্তরিক প্রীতি, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।।

Leave a Reply